Real Time True News

প্রেসার গ্রুপ ও ঝুঁকিতে দেশ

।।মিজানুর রহমান মজুমদার।।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়  ডোয়াইট ডি আইজেন হাওয়ার ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ৫ তারকা বিশিষ্ট জেনারেল ও সুপ্রিম কমান্ডার । পরে  ৩৪ তম প্রেসিডেন্ট হন। ৩৪ তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বছর খানেক আগে এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও লেখক জনৈক মার্কিন ব্যবসায়ীর  অফিসে গিয়েছিলেন  সাক্ষাত করতে। তিনি তার রুমে দু’টো ছবি দেখতে পেলেন। একজনকে তিনি চিনলেন, যাকে চিনলেন তিনি ডেমোক্রেটিক দলের টিকেটে নির্বাচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩তম প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান। অন্যজনকে চিনলেন না। বিস্ময় নিয়ে ওই ব্যবসায়ী নেতাকে প্রশ্ন করলেন, প্রেসিডেন্টর পাশে উনি কে? ব্যবসায়ী নেতা উত্তর দিলেন, উনি অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ডোয়াইট ডি আইজেন হাওয়ার, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট! খোঁচট খেলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী! ভেবেছেন, ব্যবসায়ী নেতা কী জ্যোতিষ হলেন কবে?

পরের বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন পেলেন জেনারেল (অব.) ডোয়াইট ডি আইজেন হাওয়ার। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হলেন। দু’ দফায় ১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ১৯৬১ সালে মার্কিনীদের শাসন করেছিলেন তিনি। সাধারণ জনগণের  কল্পনাও ছিলো না রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাহীন একজন সেনা নায়ককে রিপাবলিকান পার্টি আইজেন হাওয়ারকে মনোনয়ন দিবেন! মনোনয়ন পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন। জনগণ আগে থেকে না জানলেও মার্কিন ব্যবসায়ীরা জানতেন !

এটি শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নয়-সারা বিশ্বে ব্যবসায়ীরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ  প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। তারাই সিদ্ধান্ত নেন, রাষ্ট্র প্রধানরা শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন! এটি আধুনিক গণতন্ত্রের সূত্র। একজন রাষ্ট্রপ্রধান ইচ্ছা করলেও ‘প্রেসার গ্রুপ’র প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রেসার গ্রুপ বেশ শক্তিশালী হয়। তবে দেশ যত অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়-প্রেসার গ্রুপের শক্তিও কমতে থাকে। আমাদের দেশেও প্রেসার গ্রুপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। এটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত সমস্যা। যারা সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন, বিরোধীতা করেন তারা শাসকের আসনে বসলেও এর পরিবর্তন করতে পারবেন না।

গবেষণা দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের কার্যকারিতার জন্য আমলা ও ব্যবসায়িদের সহযোগিতা দরকার। এর কোন একটি অসহযোগিতা করলে দেশে অস্থিশীলতা দেখা দেয়। স্বার্থে টান পড়লে তারা ষড়যন্ত্র করে। জনগণের অতি প্রিয় সরকারকে টেনে নামাতে দ্বিধা করে না। নানা কুট-কৌশলের আশ্রয় নেয়। তারা  কখনো  নিজেরা ‘কুম্ভকর্ণ’ হয়, কখনো  চাতুরি করে অন্যকে ‘কুম্ভকর্ণ’ বানায়!

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে গার্মেন্টস কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে। কারখানা মালিকরা বলছেন, বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার সময়মত সরবরাহের তাগিদ থেকে সীমিত পরিসরে তাদেরকে কিছু কারখানা খুলতেই হচ্ছে।তারা দাবি করছেন, শ্রমিকদের সুরক্ষার নিয়মকানুন নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ সুরক্ষার মধ্যেও শ্রমিকরা দলে দলে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পোশাক কারখানা খুলে দেয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারই নমুনা দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। করোনা আক্রান্তের সংখ্যা উপরের দিকে যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতির জন্য সরকার এবং মালিকদের দিকেই আঙুল তুলেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্যবিধির কথা যা বলা হচ্ছে তার কিছুই মানা হচ্ছে না। গাদাগাদি করেই কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করছেন। ছুটির পর দেখা যায় বেহাল অবস্থা। তবে সরকার এবং মালিকপক্ষ কেউই পরিস্থিতির দায় নিতে রাজি নয়।

প্রসঙ্গত, এর আগেও এপ্রিলের শুরুতে একবার গার্মেন্টস কারখানা খোলা হচ্ছে, এই খবরে শত শত শ্রমিককে পায়ে হেঁটে বা রিক্সায় ভ্যানে করে ঢাকায় আসে। সে সময় এর দায় মালিক বা সরকার কেউ নেয়নি। এবারও কেউ দায় নিচ্ছে না। তারা বলছেন, শ্রমিকরা নিজেরা আসছেন! প্রশ্ন ওঠেছে, শ্রমিকরা মজুরি পেলে কেন এত কষ্ট করে তিন চারগুন বেশি টাকা খরচ করে কর্মস্থলে আসবেন!

গণ মাধ্যমে খবর বের হয়েছে, মালিকদের পক্ষে কারখানার কর্মকর্তা দিয়ে শ্রমিকদের টেলিফোন করিয়েছেন। যদি কর্মস্থলে না আসে, তাদের বকেয়া বেতন দেয়া হবে না, থাকবে না চাকুরি। ফলে গণ পরিবহণ বন্ধ থাকলেও, ট্রাকে, অটোতে, পায়ে হেঁটে অনেক শ্রমিক ঢাকায় এসেছেন। এ চিত্র শুধু ঢাকার নয়-সারা দেশের।

কীভাবে মালিকরা শ্রমিকদের আসতে নির্দেশ দিয়েছেন তা ‘বিবিসি বাংলার’ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রংপুর থেকে  ট্রাকে করে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে কর্মস্থলে এসেছেন ১২ নারী-পুরুষ। ‘নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের একজন জানিয়েছেন, “মোবাইল ফোনে আমাকে জানায় যে অফিস খুলছে। তোমরা চলে আস। যেভাবে হোক কারখানায় আস। তখন আমরা ১২ মিলে প্রত্যেকে এক হাজার টাকা করে দিকে ট্রাকে করে বুধবার গাজীপুরের কলিয়াকৈরে আসি। ট্রাকে আমরা বসা ছিলাম। আর আমাদের ওপর ত্রিপল দিয়া আমাদের নিয়া আসে।” মাদারিপুর থেকে ঢাকায় আসা একজন নারী শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছিলেন, “আমাদের বলছে যে, অফিস খোলা, ডিউটি করা লাগবে। তারপরে আমরা কিছু জায়গা হাঁইটা আসছি। আবার কিছু জায়গা অটো দিয়া আসছি। সিএনজি দিয়াও আসছি।”

উল্লেখিত শ্রমিকদের বক্তব্য পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, লকডাউনের মধ্য মালিকরা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে শ্রমিকদের চাকুরি না থাকা, কারখানা লে-অফ ঘোষণা এবং বকেয়া বেতনের লোভ দেখিয়ে তাদের কর্মস্থলে আসতে বাধ্য করেছেন।

দেশের ৬৪ জেলা এখন করোনাভাইরাস এর দখলে! পোশাক কারখানা খুলে দেয়ার পরপরই সিদ্ধান্ত এসেছে সীমিতভাবে শপিং মল ও দোকান খোলার। এটি করা হয়েছে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠেছে। বেশিরভাগ মানুষ এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে। তারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থে সরকারকে ভুল তথ্য দিয়ে পোশাক কারখানা খুলে দেয়ার পরপরই শপিং মল ও দোকান খুলে দেয়ার দাবি আদায় করে নিয়েছে। এর সুযোগ নিয়েছে ধর্মীয় প্রেসার গ্রুপগুলো।তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মসজিদ গুলোও খুলে দেয়া হয়েছে। সুরক্ষা, সামাজিক দূরত্বের কথা বলা হলেও এসবের বালাই নেই। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, এতে সংক্রামণের ঝুঁকি বেড়েছে। এ অবস্থায় এখন বাকি আছে গণপরিবহণ ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (who)জীবিকা ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখার নামে শীতল লকডাউন বাংলাদেশকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দিতে হবে চরম খেসারত। বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সরকারের নির্দেশনা না মানার মানসিকতা বেশ প্রবল।

এ অবস্থায় শপিং মল, দোকান, মসজিদ খোলার অনুমতি দিয়েছে। যদিও এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হৈ-চৈ করার কিছুই নেই। আপনি ঘরে ভোগ বিলাসের জন্য শপিং করতে যাবেন, নাকি অতিরিক্ত সাওয়াবের জন্য মসজিদে যাবেন সেই সিদ্ধান্ত আপনার। আশা কথা হচ্ছে, জনস্বার্থে বসুন্ধরা, যমুনা ফিউচার  পার্ক, পিংক সিটিসহ দেশের বিভিন্ন মেগা শপিং মল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। জেলা শহরগুলো থেকেও ঘোষণা আসছে। আপনি শপিং মল ও মসজিদে না গেলে যেগুলো খুলবে, সেগুলোও অটো ‘লকডাউন’ হয়ে যাবে। অকার্যকর হয়ে যাবে ‘প্রেসার গ্রুপ’। বাংলাদেশ হবে করোনা ভাইরাস মুক্ত।

-আহা