Real Time True News

মুক্তিযোদ্ধা আওয়ামী লীগ নেতা সুলতান আহমদ মজুমদারের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

বিএনএ, ছাগলনাইয়া: স্বাধীনতাত্তোর ও স্বাধীনতা পরবর্তীকালে  বৃহত্তর নোয়াখালী  (বর্তমানে ফেনী ) জেলার ছাগলনাইয়া থানা (ফুলগাজীসহ) আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সুলতান আহমদ মজুমদারের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী ১৭ মে (রোববার) পালিত হয়েছে।

১৯২১ সালে ভারত সীমান্ত লাগোয়া ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উত্তর যশপুর হাজীবাড়ী ভু-স্বামী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুলতান আহমদ মজুমদার ।  তার পিতার নাম আব্দুল হামিদ ও মাতা জামিলা খাতুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সুলতান আহমদ মেট্রিকুশলশন (এসএসসি) শেষ করেন। বাপ-দাদা ভু-স্বামী হলেও তিনি পুরাতন ঢাকা চকরাজারে  ব্যবসা করতেন। তিনি বিশিষ্ট শিল্পপতি জনাব আজিম উদ্দিন আহমেদ সাহেব (প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান- নথ সাউথ ইউনিভার্সিটি, প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক ও চেয়ারম্যান- সাউথ ইষ্ট ব্যাংক লিমিটেড, চেয়ারম্যান- মিউচুয়্যাল গ্রুপ) সহ প্রতিষ্ঠা করেন সিলোনিয়া ট্রেডার্স ও মের্সাস এস এ মজুমদার নামীয় প্রতিষ্ঠান। সিলোনিয়া ট্রেডার্স ছিল ঢাকা চক বাজারে পাইকারী পন্যের অন্যতম পরিবেশক।  প্রতিষ্ঠানের অনেক পন্যের মধ্যে  অন্যতম ব্রিকয় পন্য ছিল ডানো ও হরলিক্স।  যেহেতু জনাব আজিম উদ্দিন আহমেদ সাহেব এর সাথে তৎকালীন তিব্বত শিল্প গোষ্ঠীর  স্বত্তাধিকারী জনাব আনিস আল্লাওয়ালার সাথে ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেই সুবাধে তিব্বত গ্রুপের বিভিন্ন পণ্য যেমন: চান্দা ব্যাটারী ইত্যাদির সোল ডিষ্ট্রিবিউটর ছিলেন জনাব সুলতান আহমেদ মজুমদার।

এছাড়া তিনি এস এ মজুমদার নামীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন ঔষধ আমদানী করে বিপনন করতেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্থানী মিলিটিারীর অতর্কিত হামলা ও লুটতরাজের স্বীকার হয় তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।  পাকিস্তানী মিলিটারী বিহারীদের প্ররোচনায় তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও গুদামগৃহে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং লুটপাট করে সব নিয়ে যায়।

তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যবসায়ি ও জনাব আজিম উদ্দিন আহমেদ সাহেরব এর আত্মীয় হিসাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার সর্ম্পক গড়ে ওঠে। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফন্ট নির্বাচন, ৬৬ সালে ৬ দফা, ৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান, ৭০ সালে নির্বাচন সর্বোপুরি একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে  সক্রিয় সংগঠক ও প্রচারক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন সুলতান আহমদ মজুমদার।  নেতৃত্ব দেন ছাগলনাইয়া আওয়ামী লীগের। উল্লেখ্য যে, ঢাকায় অবস্থানকালীন সময়ে তিনি নিয়মিত ছাগলনাইয়া আসতেন এবং স্থানীয় আওয়ামীলীগকে সংগঠিত করতেন।

 

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সিলোনিয়া ট্রেডার্স ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠান ও লাগোয়া গুদাম জ্বালিয়ে দেয় বিহারীরা। তাদের কাছে তথ্য ছিল প্রতিষ্ঠানটির মালিক সুলতান আহমদ আওয়ামী লীগের নেতা। সহায়-সম্বল হারালেও মনোবল হারাননি। ফিরে আসেন গ্রামের বাড়িতে। ঢাকা থেকে ফিরে এসে প্রথমে চাচাত ভাই জনাব সফিকুর রহমান সাহেব সহ মির্জার বাজার ঈদঁগা মাঠে আশে পাশের বিভিন্ন গ্রামের বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে উৎসাহী করে ট্রেনিং দিতেন।  গ্রামের অশিক্ষিত মানুষকে ট্রেনিং দিতে তাদের ডান পায়ে কাঁচা খড় ও বাম পাশে শুকনো খড় বেঁধে দিয়ে ট্রেডিং দিতেন।  তার সাথে সহযোগী হিসেবে আরো ছিলেন জনাব মুসা পাটোয়ারী, শফিউল্লাহ, হাবিব উল্লাহ, মোঃ ইসহাক, আবুল বাশার মেম্বার, মুন্সী আবুল খায়ের ও আরো অনেকে।

তার বাড়িতেই মুক্তিযোদ্ধারা বাঙ্কার ক্যাম্প স্থাপন করেন। বাড়ির চার পাশ ও পুকুরপাড়ে ২৯টি বাঙ্কার খনন করে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদে যুদ্ধ করার ব্যবস্থা করেন। তৎকালীন ইপিআর, আনসার ও অন্যান্য সামরিক বাহিনীর সদস্য ও অন্যান্য শ্রেনী পেশার সমন্বয়ে গঠিত ৩৬০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি টিম সেখানে অবস্থান করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার পাশাপাশি অর্থ ও খাদ্য সহায়তা দিতে থাকেন।

কিন্তু বিষয়টি গোপন থাকেনি। স্থানীয় রাজাকারা পাক বাহিনীকে জানিয়ে দেয়। এরপর থেকে  তৎকালীন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী এ নেতা  ও তার পরিবারের ওপর নেমে আসে পাক বাহিনী ও রাজাকার-আলবদরদের নির্মম নির্যাতন। তাকে হত্যা করার জন্য কয়েক দফা প্রকাশ্যে ও গোপনে অভিযান চালানো হয়। এ অবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে সীমান্তের ওপারে চলে যায় সুলতান আহমদ। পরে নিজে ও তার বড় সন্তানরা  মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত ও তাদের সহায়তা করতে থাকে। সীমান্তের ওপারে ভারতে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে যে সমস্ত কমিটি গড়ে উঠেছিল এরূপ অনেকগুলো কমিটিতে সক্রীয়ভাবে কাজ করেছেন।

এপ্রিল মাসের শেষ থেকে মে মাস পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানীরা বিলোনিয়া দখলের জন্য সুলতান আহমেদ সাহেব এর বাড়ির সন্নিকটে মির্জার বাজার পর্যন্ত আসে।  তখন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ প্রচন্ড গোলাগুলির পর তারা ছাগলনাইয়া ফেরত যায়। পরবর্তীতে ৬ জুন পাকিস্তানিরা সংগঠিত হয়ে অনেক সৈন্য নিয়ে বিলোনিয়া দখলের উদ্দেশ্যে আবার মির্জার বাজার অতিক্রম করলে সুলতান আহমেদ মজুমদার এর বাড়ি থেকে মুক্তি যোদ্ধারা গুলি ছুড়ে বাঁধা সৃষ্টি করে।  সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তীব্র যুদ্ধ হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানী বাহিনী পিছু হটে।  ৬ জুনের পর থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত থেমে থেমে প্রায় উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। ১৯ জুন মুক্তিবাহিনীর উপরের কমান্ড (তৎকালীন ক্যাপ্টেন ওলি আহমেদ)  থেকে নির্দেশ আসায় মুক্তিফৌজ এখান থেকে প্রত্যাহার করে ২ কিলোমিটার উত্তরে চাঁদগাজীতে গিয়ে অবস্থান নেয়।  তার পরেও ভারত থেকে এসে গেরিলা যোদ্ধারা অবস্থান নিত তার বাড়িতে অবস্থান নিতো। পাকিস্তানীরা কাপ্টেন লিংক রোড দিয়ে চলাচলের সময় গেরিলা যোদ্ধারা তাদের উপর গুলি চালাত। এভাবে প্রতিনিয়ত গেরিলা যুদ্ধ হত। এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারা। ১৯৭১ সালের ১৪ আগষ্ট  পাকিস্থানের  স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে  ছাগলনাইয়া থানা সদরে রাজাকার ও পাক বাহিনী এক সমাবেশ হয়। সেখান থেকে পরিকল্পনা হয়  সুলতান আহমদকে হত্যা ও তার বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার। ওইদিন দুপুরের দিকে  রাজাকারদের  একটি দল তার বাড়িতে ভাঙ্গচুর ও লুটপাট চালায়। জ্বালিয়ে দেয় পুরো বাড়ি।  তারা   সুলতান আহমদ মজুমদারকে বাড়িতে খুজে পায়নি। ইতিমধ্যে তার এক চাচাতো ভাই আব্দুর রশীদকে হত্যা করে।

আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা সুলতান আহমদ মজুমদার   কয়েক সহযোগিকে নিয়ে বিলনিয়া সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতা করে এলাকাটি শত্রু মুক্ত করার চেষ্টা করতে থাকেন।  ২রা ডিসেম্ব ১৯৭১ সাল  ত্রিপুরা সীমান্তের নলুয়া ও জয়পুর দিয়ে ও বিলনিয়া থেকে আসা যৌথবাহিনী অপারেশন চালায়। ২রা ডিসেম্বর উত্তর যশপুর ও আশপাশের গ্রাম দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের যৌথবাহিনী এগুতে থাকে এবং সুলতান আহমেদ এর বাড়ি সংলগ্ন এলাকা থেকে উত্তরে চাঁদগাজী বাজার পশ্চিমে ধোপাদীঘি ও দক্ষিণে মির্জার বাজারে অবস্থানরত পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে প্রচন্ড যুদ্ধ হয় এবং যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানী বাহিনী আত্ম সমর্পনে বাধ্য হয়। এবং বিভিন্ন দিক থেকে মুক্তি যোদ্ধাদের প্রবল আক্রমনের মুখে ছাগলনাইয়া ফুলগাজী বিলোনিয়া ডিসেম্বর এর প্রথম সপ্তাহে শত্রু মুক্ত হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা সুলতান আহমদ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগী হন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষাই বাঙ্গালী জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।তারই পৃষ্টপোষকতায় গড়ে ওঠে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, এতিমখানা।এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ণে তিনি সরকারি বরাদ্দ আনার ব্যবস্থা করেই ক্ষান্ত হননি পাশাপাশি  ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন  উন্নয়ন কর্মকান্ডে যুক্ত হন। ১৯৯৬ সালের ১৮ মে দিবাগত রাতে ছাগলনাইয়া আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সুলতান আহমদ ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ৭ ছেলে ও ৪ মেয়ের জনক। তারা সবাই প্রতিষ্ঠিত ও যৌথ পরিবারে বসবাস করেন। সেকারণে স্থানীয় লোকজন তাকে রত্নজনক সুলতান আহমদ নামে ডাকতেন।

প্রসঙ্গত: দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক গ্রুপ পোর্টল্যান্ড মরহুম সুলতান আহমদের সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। পোর্টল্যান্ড গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন তার ছেলে  এম নুরুল হোসেন খোকা,  ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান মজুমদার, পরিচালক (অর্থ) জাকির হোসেন, পরিচালক (মানব সম্পদ ও প্রশাসন) রবিউল হোসেন বাবু, পরিচালক (ক্রয় ও সরবরাহ) মোমিনুর রহমান। এছাড়া তার বড় দুই সন্তান কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। তারা হলেন মিচুয়্যাল গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ এবং মাকেন্টাইল ব্যাংকের  সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি) এবং গবেষণা ও পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান আবু সৈয়দ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।

পোর্টল্যান্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান মজুমদার পরিবারে পক্ষ থেকে তাদের পিতা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম সুলতান আহমদের জন্য দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাস মহামারি ও  সরকারি নির্দেশনা মান্য করে এবার মরহুম সুলতান আহমদের মৃত্যুবার্ষিকী পালনে কোন আড়ম্বর আয়োজন করা হয়নি। তবে সুলতান আহমদ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ফেনী জেলার ছাগলনাইয়ার উত্তর যশপুর হাজী বাড়িতে  কয়েক গ্রামের দুস্থ: ও শ্রমজীবী বেকার পরিবারে খাদ্য সামগ্রী প্রেরণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরেও কিছু এতিমখানায় একই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

এছাড়া সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে রওশন ফকির (রা) মাজারস্থ মসজিদ ও মাদ্রাসায় খতমে কোরআনের  আয়োজন করা হয় বলে জানান মিজানুর রহমান মজুমদার।