Real Time True News

কর্মীদের বেতন কমালে লোকসান ব্যাংকের!

।।মিজানুর রহমান মজুমদার।।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস ( বিএবি) করোনাভাইরাস উদ্ভূত ‘অর্থনৈতিক মন্দা’ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বেতন ভাতা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ ব্যাংকের পরিচালকরা তাদের লভ্যাংশ, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিদা না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। এতে ব্যাংককর্মীদের মধ্য বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। হতাশা দেখা দিয়েছে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে। প্রভাব পড়েছে তাদের মনোবলে।ব্যাংক সেক্টরে এ নিয়ে শুরু হয়েছে অস্থিরতা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৯টি ব্যাংকে বর্তমানে জনবল রয়েছে এক লাখ ৭৮ হাজার ৪৩০ জন। এর মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকে আছেন এক লাখ ৯ হাজার ১২৭ জন। বিদেশি ব্যাংকে তিন হাজার ৮৫৮ জন। আর সরকারি ব্যাংকে ৬৫ হাজার ৪৪৫ জন।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) বেতন কমানের এ সিদ্ধান্ত ব্যাংক গুলোর জন্য বুমেরাং হতে পারে। ব্যাংক লোকসান কমবে না বরং বাড়বে! ব্যাংকগুলো ‘রেপুটেশন লস’-এ পড়বে। গ্রাহকদের কাছে যখন এ ম্যাসেজ যাবে- ব্যাংকের অবস্থা খারাপ। তখন ডিপোজিট তোলার হিড়িক পড়ে যাবে।এতে ব্যাংক আরো দুর্বল হবে। কমে যাবে শেয়ারের দাম । ব্যাংক যতই তার কর্মীদের তাগাদা দিক না কেন, তারা আর আগের স্পিরিট নিয়ে ডিপোজিটের জন্য কাজ করবে না। হবে না ডেডিকেটেড।

সবমিলিয়ে অস্থিতিশীল এক পরিবেশে কাজ করছে ব্যাংককর্মীরা। তারা এখন সারাক্ষণ চিন্তা করছে, হয়ত ভাল এলাকার বাসা ছেড়ে কম ভাড়ার এলাকায় যেতে হবে।কম বেতনের স্কুলে দিতে হবে সন্তানদের । ব্যাংককর্মীরা বলতে শুরু করেছেন, করোনা কালে জীবনের মায়া না করে দিনের পর দিন ব্যাংকিং সেবা দেয়ার এই তার প্রতিদান?

গত ১৪ জুন ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) করোনাভাইরাস মহামারিতে উদ্ভূত ‘অর্থনৈতিক মন্দা’ বিষয়ে এক বৈঠক করে। বৈঠকে ব্যাংক কর্মীদের বেতন কমানো, প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট, ইনসেনটিভ বোনাস আগামী দেড় বছর বন্ধ রাখারও পরামর্শ দিয়েছে। এতে ব্যাংককর্মীরা ব্যাথিত হয়েছেন । তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যেও নিয়মিত অফিস করতে হয়েছে, হচ্ছে। অনেকে মারা গেছে এবং যাচ্ছেন।করোনার মহামারি চলাকালে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমার কথা বলে ব্যাংকারদের বেতন কমানোর মাতাব্বরি ঘোষণা দিয়েছে বিএবি।

এরই মধ্যে বেসরকারি খাতের এক্সিম, দ্য সিটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ও এবি ব্যাংক বেতন কমিয়েছে। অথচ যুগযুগ ধরে এ সব ব্যাংক মালিকরা শত কোটি টাকা আয় করেছে। উচ্চহারে সুদ আরোপ করেছে। নানাভাবে গ্রাহকদের থেকে আদায় করেছে সার্ভিস চার্জ। পরস্পর সিন্ডিকেট করে ব্যাংক থেকে নানা কৌশলে হাজার হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে। খেলাপি লোনের ৯০ শতাংশ পরিচালক পর্যদের পরিচিত ব্যবসায়ি ও শিল্পপতি অথবা তাদের আত্বীয় স্বজন।

ব্যাংককর্মীদের সঙ্গে আলাপে জানানা গেছে, এই দুঃসময়ে ব্যাংককর্মীদের বেতনে কাটছাঁট করায় তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তাদের কর্মস্পৃহা কমে গেছে। যার প্রভাব পড়বে খেলাপি ঋণ আদায়সহ নানাবিধ কাজে। এতে ব্যাংকের ব্যবসায়ের প্রবৃদ্ধি যেমন কমবে তেমনি কমবে মুনাফা। ব্যাংকারগণ কৃচ্ছতা সাধন করতে গিয়ে তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে দেখা দিবে নেতিবাচক পরিবর্তন।

একই বৈঠকে ব্যাংকের চলমান নিয়োগসহ সব ধরণের নিয়োগ বন্ধসহ এক গুচ্ছ প্রস্তাবনা তৈরী করা হয়। যা ব্যাংক অ্যাসোসিয়েশন সদস্যদের জন্য কাছে পাঠানো হয়েছে।

সদস্যদের দেয়া এক চিঠিতে সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল জানিয়েছেন, কোভিড-১৯ উদ্ভূত অর্থনৈতিক মন্দার প্রেক্ষাপটে বেতন কমানোর প্রস্তাবে ১৩টি কারণ দেখিয়েছে বিবিএ। এ গুলো হচ্ছে:

১)ব্যাংকে বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়া।২) বিনিয়োগের উপরে সুদের/মুনাফার হার কমে যাওয়া।৩) রিকভারি প্রায় শূন্য।৪)ওভারভিউ বেড়ে চলা।৫) আমদানি রপ্তানি কমে যাওয়া।৬)বিশ্বব্যাপী ফরেন ট্রেড কমে যাওয়া।৭)রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যাওয়া।৮) ক্রেডিট কার্ডে রিকভারি কমে যাওয়া।৯) এপ্রিল ও মে এই দু মাসে প্রাপ্য মুনাফা/সুদ এক বছরের জন্য ব্লক রাখা।১০)বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্দেশিত প্রণোদনা বাবদ দুই মাসে কোভিড-১৯ ব্যাংকিং সেবা দেয়ায় বিপুল অংকের ব্যয় হওয়া।১১) কোভিড-১৯ প্রতিরোধে সেনিটাইজেশন ও অন্য স্বাস্থ্যবিধি পালনে বাড়তি খরচ।১২) কোভিড-১০ পজিটিভ/মৃত কর্মকর্তা কর্মচারীদের চিকিৎসা ব্যয় ও স্বাস্থ্য বীমা বাদা বিপুল অর্থ ব্যয়।১৩)আয় কমে যাওয়ায় নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হওয়া।

চিটিতে আরো বলা হয়,কর্মী ছাটাই না করে ব্যাংককে সচল রাখার জন্য চলতি বছর পহেলা জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য ৯টি পরামর্শ দেয়া হয়েছে, সেগুলো হলো: ১)নতুন শাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা এবং সাব ব্রাঞ্চ খোলা বন্ধ রাখা। ২)সম্পদ (ফিক্সড) ক্রয় বন্ধ রাখা। ৩)স্থানীয় ও বিদেশে ট্রেনিং বন্ধ রাখা। ৪)সব বিদেশ ট্যুর বন্ধ রাখা।৫)সিএসআর, ডোনেশন ও চ্যারিটি বন্ধ রাখা)।৬)পত্রিকা ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখা।৭)সব কাস্টমার গেট-টুগেদার বন্ধ রাখা।৮)কর্মকর্তাদের গেট টুগেদার বা ম্যানেজারদের কনফারেন্স বন্ধ করা। দরকার হলে ভার্চুয়ালি করা।৯)আইটি সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ক্রয় সীমিত রাখা।

ব্যাংকে কখনো মন্দা ছিলো না। তারা অসময়েও মুনাফা করেছে। এখন কম লাভ হলে তাতে কর্মচারীদের বেতন কেন কাটতে হবে? কোন ব্যাংক যদি মনে করে করবে সেটা তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে, বিবেচনায় করবে। ব্যাংকের ডাইরেক্টররা সভা করে যে পরামর্শ দিয়েছেন সেখানে তারা বেতন কাটার কথায় সায় দিয়েছেন।যদিও এই সিদ্ধান্ত আসা উচিত ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে। কিন্তু সেটা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ মনে করেন যে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় মালিকদের “এভাবে হস্তক্ষেপ অনৈতিক, এমনকি বেআইনিও বলা যেতে পারে”। তিনি বলেন, “বিএবি’র তো এসব বিষয়ে কথা বলাই উচিত হয়নি। ব্যাংকের যে নিজস্ব বোর্ড আছে, এগুলো তাদের কাজ। “ব্যাংকের যে টাকা সেটা মালিকদের নয়, আমানতকারীদের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে মালিকরা যেন ব্যাংকের বোর্ডের কাজ নিয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ না পায়”।

ব্যাংক মালিকদের এ ধরণের প্রস্তাবে ব্যাংক কর্মীরা “ডিমোরালাইজড” হবে বলে উল্লেখ করেছেন ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বা এবিবি চেয়ারম্যান ও ইবিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার। তিনি বলেন, বিএবি কোনো রেগুলেটরি বোর্ড না এবং কোনো ব্যাংক তাদের কথায় সিদ্ধান্ত নেবে না। এসব বিষয়ে ব্যাংকগুলো যার যার মতো করে অবস্থা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। বিএবি’র কথায় কিছু হবে না”।

বিএবি’র উদ্যোগটিকে “অদ্ভুত” আখ্যায়িত করেছেন এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মেহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, “আমি মনে করি এটা ভুল বার্তা দিতে পারে কর্মীদের। সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ব্যাংক কর্মীদের জন্য মোটিভেশন আরও জরুরি।

বাংলার ইতিহাসে সিরাজদ্দৌলা এক অমর চরিত্র। আমাদের দেশে একসময় সিরাজদ্দৌলা নাটক ও সিনেমা এতটাই জনপ্রিয় ছিলো যে, এর বিভিন্ন সংলাপ মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। এর অন্যতম সংলাপ ‘বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা, ….এই দুর্দিনে কে দেবে আশা, কে দেবে ভরসা,’। বিএবি’র সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে যখন এমন অস্থির- ত্রাহি অবস্থা বিরাজ করছে। তখন ত্রাণ কর্তার ভূমিকায় নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস ( বিএবি) এর সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বেসরকারি ব্যাংককর্মীদের আশার আলো দেখিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৯ জুন রাতে এক নির্দেশনা জারি করে তা সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের এই কঠিন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভূমিকা অগ্রগণ্য ও অনস্বীকার্য। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো এবং জিডিপির কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অধিকতর উজ্জীবিত হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ঋণ প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে যাতে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করতে পারে, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়। এতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে আপাতত: স্বস্তি ফিরে এসেছে।

প্রসঙ্গত: ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব, খেলাপি ঋণের অসহনীয় চাপ, অদক্ষতা, ঋণ কেলেঙ্কারি, অনিয়ম এই খাতকে খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। ১৫টির অধিক ব্যাংক ভুগছে ক্যাপিটাল সংকটে। আরও ১৫টির মত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশাসক বসিয়েছে ব্যাংক মালিকদের দৌরাত্ব কমানোর জন্য।

করোনাকালীন সময়ে এককভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এমন সিদ্ধান্ত ব্যাংক কর্মীদের মধ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের ডিমোটিভেশনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সব সেক্টরের মতো ব্যাংক কর্মীরাও আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত দিক থেকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন এবং এ সময়ে বরং তাদের জন্য মোটিভেশন জরুরি। তবে ব্যাংক যদি মনে করে তাদের লোকসান হচ্ছে, এমন সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে সে ক্ষেত্রে মালিক কর্মী উভয়কে ছাড় দিতে হবে। একটি কর্মপরিকলপনা গ্রহণ করতে হবে কৃচ্ছতা সাধনের মাধ্যমে। কর্মীদের এ ব্যাপারে মোটিভেশন করতে হবে। উপর থেকে কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তা শুভফল বয়ে আনবে না। কেননা, ব্যাংকিং ব্যবসার মুল চালিকা শক্তি কর্মী এবং নেতৃত্ব। এর কোনটিতে হতাশা দেখা দিলে ব্যাংকিং সেক্টরে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। যা দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ পড়বে। নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে।