Real Time True News

নকল সুরক্ষা সামগ্রী করোনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

।।আমিন মুহাম্মদ।।

দেশের মানুষ যখন জ্যামিতিকহারে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে, তখন এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নকল সুরক্ষা সামগ্রীর রমরমা ব্যবসা করছে। প্রচলিত দামের চেয়ে নকল এসব সামগ্রী দুইতিন গুন বাড়তি দামে  বিক্রি করছে সারাদেশের হাটে-ঘাটে-বাজারে। হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, এসব নকল ও ভেজাল সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করে লাখ লাখ মানুষকে করোনায় আক্রান্তের ঝুঁকিতে ফেলেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রং মিশানো নকল হ্যান্ড স্যানেটাইজার, মানহীন মাস্ক, পিপিই, হ্যান্ডগ্লাভস নকল ব্লিচিং পাউডার, ডেটল, হেক্সিসল, সেভলন ও অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রীতে বাজার সয়লাব। কোনটি আসল, কোনটা নকল তা বুঝার উপায় নেই! বিভিন্ন নামে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সুরক্ষামূলক এসব সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। সাধারণ মানুষের চাহিদার সুযোগে একটি সিন্ডিকেট ভেজাল এসব পণ্য উচ্চ মূল্যে বাজারে ছাড়ছে। করোনাভাইরাস থেকে নিজে ও পরিবারকে সুরক্ষা দিতে এসব পণ্য সরল বিশ্বাসে কিনে নিচ্ছে। অজান্তেই অচেনা প্রাণঘাতি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অনেকে প্রাণ হারাচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যেসব মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস পিপিই, হ্যান্ড সেনিটাইজার বাজারে পাওয়া যাচ্ছে এর বেশিরভাগই নকল ও মানহীন। এগুলো ব্যবহারে করোনা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। ৯৫ মাস্কের নামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে এফএফপি-১এস মাস্ক। আবার আইসোপ্রোপাইল এলকোহল ছাড়া শুধু পানি ও রঙ মিশিয়ে বানানো হচ্ছে নকল হ্যান্ড সেনিটাইজার। এসব নকল পণ্য দেশে আরো স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে এসব পণ্য করোনার আগে ব্যবহার করতো ২/৩ শতাংশ মানুষ। এখন শতভাগ মানুষ এসব পণ্য ব্যবহার করছেন। যেভাবে ব্যবহার বেড়েছে, সেভাবে উৎপাদন বাড়েনি। বিদেশ থেকে কাঁচামাল আনতে হয়। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন না বাড়ার ফলে এসব পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছেন। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার আশায় সিন্ডিকেট করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন।

বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এসেছে। দেশের বিভিন্নস্থানে বিচ্ছিন্ন অভিযানও চলছে। কিন্তু কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না।

আরো পড়ুন : ভেজাল স্যানিটাইজার কারখানার সন্ধান:আটক চার

গত ২১ জুন চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার বিবিরহাট এলাকা থেকে নকল হ্যান্ড স্যানেটাইজার ও অনুমোদনহীন মাস্ক অধিক মূল্যে বিক্রির দায়ে মো. আমজাদ হোসেন(৩৪)নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে র‌্যাপিড  এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন  (র‌্যাব)। এ সময় তার কাছ থেকে ৩৫ লিটার নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং বিপুল পরিমান অনুমোদনহীন মাস্ক উদ্ধার করা হয়।

গত ২২ জুন ২০২০ রাজধানীর উত্তরা তিন নম্বর সেক্টরের ১৩ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর ভবনে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব ও ওষুধ প্রশাসন। এ সময় জাহানারা এন্টারপ্রাইজের মালিক মাসুদ চৌধুরীকে এন-৯৫ নকল মাস্ক আমদানি ও মজুত করার দায়ে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

একইদিন চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার পাহাড়তলী বাজার এলাকা থেকে ৫৬০ কেজি নকল ব্লিচিং পাউডারসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- হেনরি রিবেরো ওরফে হেনরি কামাল (৪৮), মো. নুর নবী (৪৬) ও মো. মিজান (৩৮)।

জানতে চাইলে ডবলমুরিং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জহির হোসেন বাংলাদেশ নিউজ এসেন্সি (বিএনএ)কে বলেন, উল্লেখিত ব্যক্তিরা সেনোয়ারা গেস্ট হাউজের চতুর্থ তলার একটি কক্ষে নিউ বিদ্যুৎ ব্লিচিং পাউডার নামে প্যাকেটজাত করছিল। যা দেখতে চুনা সদৃশ। খবর পেয়ে তাদের হাতে নাতে গ্রেফতার করা হয়। করোনা ভাইরাসকে পুঁজি করে অসাধু লোকজন সাধারণ মানুষকে জেনে শুনে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন  জহির হোসেন।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের বিভাগীয় সহকারী পরিচালক হোসাইন মোহাম্মদ ইমরান বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি(বিএনএ)কে বলেন, এ বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে। নিয়মিত অভিযান চলছে। একটি সিন্ডিকেট এসব করছে, তাদের ধরতে প্রচেষ্ঠা অব্যাহত আছে।

চিকিৎসা ও ওষুধ বিপণনে জড়িত অসাধুদের রাজনৈতিক মদদ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম। ২৪ জুন ২০২০ গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে ক্যাব কেন্দ্রিয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারন সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, ক্যাব মহানগরের সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু, সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, যুগ্ন সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম, ক্যাব চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সভাপতি আলহাজ্ব আবদুল মান্নান, ক্যাব যুব গ্রুপের সভাপতি চৌধুরী কে এনএম রিয়াদ ও সম্পাদক নিপা দাস এ দাবি জানান। তারা বলেন, সুরক্ষা সামগ্রী ও চিকিৎসা নিয়ে যে নৈরাজ্য চলছে তার লাগাম এখনই টানা জরুরি।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেছেন,নকল, ভেজাল ও অনিবন্ধিত ওষুধী পণ্য বিক্রিকারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট এবং র‌্যাব, সেনাবাহিনীর চিরুনি অভিযান প্রয়োজন।একটি সভ্য দেশে এসব চলতে পারে না মন্তব্য করে জিয়া হাবীব তাদের এ্যাকাউন্ট সীজ, বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগ, জেল জরিমানা, সামারি ট্রায়াল ইত্যাদির দাবি জানান।

র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)’র নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সারওয়ার আলম বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)কে বলেন, এন-৯৫ মাস্ক আমেরিকা ও চীনে তৈরি হয়। বর্তমান বিশ্বে এ মাস্কের তীব্র সংকট রয়েছে। এটার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী চীন থেকে মাস্ক আমদানি করে গায়ে এন-৯৫ সিল লাগিয়ে দিয়ে বিক্রি করছে।

সরওয়ার আলম আরো মন্তব্য করেন, করোনার মহামারীতে সুরক্ষামূলক সামগ্রীগুলো নকল হলে, তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। ক্রেতারা সরল বিশ্বাসে করে এসব পণ্য ব্যবহার করছেন। কিন্তু নকল হওয়ায় তা করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধতো হচ্ছেই না বরং বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিএনএ/ওয়াই এইচ