Real Time True News

শিক্ষিত তরুণদের চোখে অন্ধকার

বিএনএ, ঢাকা: অনেক কষ্ট করে, খেয়ে না-খেয়ে ছেলে আরিফকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন বাবা-মা। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের পাঠ চুকেছে, পড়াশোনা শেষ। এখন আশা-ছেলে একদিন বড় চাকরি পাবে, ভালো বেতনে কেটে যাবে সংসারের অভাব-অনটন। কিন্তু সেই আশা আজ পরিণত হতে বসেছে নিরাশায়।

বৈশ্বিক মহামারী করোনার কুপ্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রেও। যার ঢেউ আছড়ে পড়েছে নিভৃতপল্লীর সেই বাবা-মায়ের সংসারে। আরিফুল ইসলামের মতো তরুণরা যখন সংসারের হাল ধরতে প্রস্তুত, ঠিক তখনই তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে করোনার তোড়ে। এই বেকারত্ব কবে শেষ হবে- জানে না এই তরুণদের কেউ। প্রতিবছর বাংলাদেশের চাকরির বাজারে নতুন যোগ হয় প্রায় ২০ লাখ তরুণ-তরুণী। এদের বড় একটি অংশ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এমনিতেই দেশে বেকারত্বের হার অনেক। তার ওপর এবার করোনা ভাইরাসের কারণে সেই সংকট আরো বেড়েছে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ২০১৮ সালে স্নাতকোত্তর করেছেন তানজিলা আক্তার। আশা করছিলেন, এ বছর একটা ভালো চাকরি হয়ে যাবে। কিন্তু করোনার কারণে তার সেই স্বপ্ন থমকে গেছে। তিনি জানান, তার বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে, এখন তার পরিবারের দায়িত্ব নেয়ার কথা। কিন্তু এই মহামারীর কারণে তিনি সেটা করতে পারছেন না। কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘এখন তো মহামারীর কারণে সবকিছুই আটকে আছে। কোনো সার্কুলার নেই, কোনো চাকরির পরীক্ষা নেই। এই মহামারী কবে শেষ হবে, কবে আবার চাকরির প্রক্রিয়া শুরু হবে জানি না। আমরা যারা বেকার আছি, চাকরির খুব প্রয়োজন, তাদের জীবনটা এই মহামারীর কারণে একটা অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কোনো কাজ নেই, যত দিন যাচ্ছে পরিবারের বোঝা হয়ে যাচ্ছি। পরিবারের সদস্যদের মলিন মুখ সেই হতাশা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

তানজিলার মতোই আরেকজন চাকরি প্রত্যাশী আজাদুর রহমান। স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন ২০১৭ সালে। কয়েক বছর ধরেই তিনি সরকারি চাকরির চেষ্টা করছেন। তবু হতাশ হননি। তবে এবার করোনার ধাক্কায় আত্মবিশ্বাস নড়ে গেছে তার। ‘আমি শুধু সরকারি চাকরির জন্যই কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করছি। এ বছর ৪১তম বিসিএসের পরীক্ষা হবে ভাবছিলাম। করোনার কারণে সব আটকে গেল। এদিকে চাকরির বয়সও শেষ হতে চলেছে। সবকিছু মিলিয়ে একটা মানসিক চাপ আর কষ্টে দিন কাটছে।’ হতাশ কণ্ঠে বলেন আজাদ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ৪.২% হলেও যুব বেকারত্বের হার ১১.৬ শতাংশ। করোনা ভাইরাসের কারণে জুন ২০২০ সাল নাগাদ সেটি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, করোনা ভাইরাস সংকটে বিশ্বে প্রতি ছয়জনের একজন বেকার হয়েছে আর বাংলাদেশের প্রতি চারজন যুবকের মধ্যে একজন কর্মহীন বা বেকার রয়েছে (২৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ)। ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই এই বেকারত্ব বাড়ছে। আইএলও বলছে, মহামারীতে তারা তিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে বেকারত্ব, সেই সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণও ব্যাহত হচ্ছে তাদের। এতে তাদের চাকরিতে প্রবেশ ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে।

আইএলওর সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে এক দিন বা এক ঘণ্টা কাজের সুযোগ না পেলে ওই ব্যক্তিকে বেকার হিসাবে ধরা হয়। সেই হিসাবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৭ লাখ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংখ্যা বাস্তবে অনেক বেশি। করোনা ভাইরাসের কারণে তৈরি হওয়া মন্দায় ব্যাংকিং, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বড় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান খরচ কমাতে কর্মী ছাঁটাই করছে। আর বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের চাকরি-সংক্রান্ত একটি জনপ্রিয় ওয়েবসাইট বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী একেএম ফাহিম মাশরুর বলছেন, ফেব্রুয়ারির পর থেকে চাকরির বিজ্ঞাপন অনেক কমে গেছে। যেসব চাকরির বিজ্ঞাপন আসছে, সেখানেও অভিজ্ঞ কর্মী চাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আগে যে রকম বিজ্ঞাপন আসত, করোনার কারণে সেটা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমে গেছে। মে মাসে একটু বাড়লেও এখনো ৫০ শতাংশ কম আছে। যেসব বিজ্ঞাপন আসছে, সেখানে অভিজ্ঞ লোক চাওয়া হচ্ছে, ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা আরো অনেক কমে গেছে।

দুই বছর ধরে সরকারি চাকরির পাশাপাশি সম্প্রতি বেসরকারি চাকরি খুঁজতে শুরু করেছিলেন নাহিদুজ্জামান লিটু। তিনি বলেন, ‘শুরুতে তো সরকারি চাকরির চেষ্টাই করতাম। কিন্তু সম্প্রতি বেসরকারি চাকরির আবেদন করতে শুরু করেছিলাম। এক-দুইটা ইন্টারভিউ দিয়েছি। এর মধ্যেই তো সব আটকে গেল।’ তিনি বলছেন, এসব কারণে তিনি মানসিকভাবে চাপের মধ্যে পড়েছেন।

একদিকে বন্ধুদের সঙ্গে বাসা ভাড়া করে থাকতে হয়, পড়াশোনা শেষ করার পরেও বাড়ি থেকে সাপোর্ট নিতে হচ্ছে। দুই-তিন মাসের মধ্যে একটা চাকরি পাওয়ার আশা করেছিলেন। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে তার সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। বাংলাদেশের ব্যাংক, বহুজাতিক বা বড় কোম্পানিগুলো গত কয়েক মাস ব্যবসা না হওয়ায় কর্মী ছাঁটাই বা বর্তমান কর্মীদের বেতন কমিয়ে দিচ্ছে। ব্যাংকগুলো বলছে, আগে থেকেই খেলাপি ঋণের চাপ, তারল্য সংকট, তার ওপর ব্যবসা-বাণিজ্যের অবনতির কারণে করোনা ভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাবে তাদের ব্যবসা খাদের কিনারে। ব্যয় কমানো ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। বেতন না কমালে ছাঁটাই করতে হবে।

বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলছেন, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো লোক ছাঁটাই করছে না, কিন্তু ছোট বা মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু অনেক কর্মী ছাঁটাই করছে। ডেভেলপমেন্ট সেক্টর, এনজিও বা ই-কমার্স কোম্পানি ছাড়া আর কেউ এখন কর্মী নিয়োগ করছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, অত্যন্ত জরুরি না হলে তাদের প্রতিষ্ঠানে আপাতত কয়েক মাস কোনো রকম নিয়োগ কার্যক্রম না করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে শীর্ষ পর্যায় থেকে। একটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানির এক কর্মকর্তা জানান, অত্যন্ত জরুরি নয়, এমন কর্মীদের তালিকা চাওয়া হয়েছে মানবসম্পদ বিভাগ থেকে। আপাতত তাদের বেতন কিছুটা কমিয়ে দিয়ে কর্মী ছাঁটাই না করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু মন্দা অব্যাহত থাকলে নতুন নিয়োগ তো বন্ধই, তিনি একপর্যায়ে কর্মী ছাঁটাই শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের প্রতি বছর অনেকগুলো সার্কুলার থাকে। এ বছর ছয়মাস হয়ে গেল, সরকারি কোনো নিয়োগ নেই। আবার বেসরকারি খাতে পুরোটাই বন্ধ আছে। যারা চালু আছে, তারাও সীমিত লোক নিয়ে কাজ করছে। ফলে নতুন করে লোকবল নিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, মহামারীর কারণে আর্থিক মন্দা বহাল থাকবে আরো কিছুদিন। যার প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি পড়বে চাকরির বাজারেও।

আইএলওর একটি প্রতিবেদনে বলছে, কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে এই বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে আগামী তিন মাসের মধ্যে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ তাদের পূর্ণকালীন চাকরি হারাতে যাচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্বের পূর্ণ বা খণ্ডকালীন মোট কর্মশক্তির প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনের পেশা কোনো না কোনোভাবে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই ক্ষতির শিকার বড় একটি অংশ তরুণ-তরুণীরা। সংস্থার মহাপরিচালক গাই রাইডার বলেন, জরুরিভিত্তিতে তরুণদের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু করা না গেলে এই ক্ষতির জের টানতে হতে পারে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের প্রধান নির্বাহী ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, নতুন চাকরি তো নেই, যারা ছিল, তাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে। তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে তরুণদের ওপর। যত দিন পর্যন্ত অর্থনীতি ঠিক না হবে, তত দিন তাদের সবার শ্রমবাজারে প্রবেশ করাটা কঠিন হবে। এমনকি করোনা পরবর্তী সময়েও যেসব কাজের সৃষ্টি হবে, সেগুলোর ধরন কিন্তু অন্য রকম হবে। এখন যেমন বেশির ভাগ কাজকর্ম ঘরে বসে হচ্ছে। ফলে ডিজিটাল বা আইটিবেজড কাজ বেশি হবে। ফলে আগের গতানুগতিক শিক্ষা দিয়ে চাকরি পাওয়া যাবে না।