Real Time True News

কাঁদে দেশ, কাঁদে মানবতা, গিটারিস্ট এখন সবজি বিক্রেতা!

।।মনির ফয়সাল।।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের কবলে পড়ে অনেকের জীবন-জীবিকা বদলে গেছে। যাদের হাতে গিটার বা ড্রামের স্টিক ছিল তাদের হাতে আজ সবজির ঝুড়ি আর ভ্যানের হ্যান্ডেল। করোনাভাইরাসে সরাসরি শিকার না হয়েও তার উত্তাপেই লণ্ডভণ্ড জীবনচিত্র । মানবেতর জীবন করছে কোটি কোটি মানুষ।

আরমান (ছদ্মনাম)। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চলত শো। শো এর আগে সারাটা দিন জুড়ে প্র্যাকটিস করত। ২২ বছর ধরে তিনি ব্যান্ড জগতে গিটার বাজিয়ে গেছেন। খ্যাতি ছড়িয়েছে গিটারিস্ট হিরো হিসাবে। আয়-রোজগার ছিল ভাল। আরমান কখনো ভাবেনি অন্য কোন পেশার কথা। কিন্তু এখন। করোনার ছোবল তার জীবন-জীবিকা লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাস তাকে নিয়ে গেছে নতুন এক জগতে, নতুন এক পেশায়।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি(বিএনএ)কে তিনি বলেন,
১৯৯৭ সাল গিটারের সঙ্গে সখ্যতা। এক সময় নেশা থাকলেও পরে সেটিকেই পেশা হিসাবে নিয়েছিলেন। দীর্ঘ দুই দশক ধরে মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন। কিন্তু এখন নিজের জীবনটাই ভারাক্রান্ত, হতাশাগ্রস্ত।  কখনো চিন্তা করেন নাই এমন হবে ! করোনায় বন্ধ সব ধরনের সামাজিক আয়োজন। তিন মাসের বেশি বেকার। নিজেদের দু’ বেলা খাওয়া জুটছে না, বাড়িওয়ালা বাড়ি ছেড়ে দেয়ার তাগিদ দিচ্ছে। সন্তানদের স্কুলের মাইনে বকেয়া, অনলাইনে লেখা পড়াও বন্ধ। এমনও দিন গেছে লাইনে দাঁড়িয়ে সাহায্য নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। এখন তিনি তরকারি বিক্রি করে সংসার চালান।

করোনাকালীন তরকারি ব্যাপারি মিউজিশিয়ান বলেন, সরকার অন্যান্য সেক্টরে অনেক সাহায্য করছে। প্রণোদনা দিচ্ছে। কিন্তু তাদের জন্য কিছুই করেননি সরকারি-বেসরকারি কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ের কোন প্রতিষ্ঠান।

আরমানের কষ্ট, তিনি পেশাদার তরকারি ব্যাপারি নয়- একজন মিউজিশিয়ান। শুধু তিনি নন, এই পেশায় যারা আছে তাদের সকলের অবস্থা আরমানের মতো।

৩০ বছর ধরে ড্রামের স্টিক হাতে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে হারুন(ছদ্মনাম)। কিন্তু করোনায় সে হাতে ওঠেছে পাল্লা ও তিন চাকার রিক্সা ভ্যান। সবজি নিয়ে ঘুরে বেড়ান পুরো শহর। কখনো নগরীর কোতোয়ালী কখনো সদরঘাট বা কখনো পাথরঘাটা এলাকায় সবজি বিক্রি করতে দেখা যায় এই ব্যান্ড শিল্পীকে।

বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)কে তিনি বলেন, করোনায় সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে। আগে প্রোগ্রাম করে মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হতো।এখন প্রোগ্রাম নেই, আয়ও নাই। তাই সংসার খরচ আর বাড়ি ভাড়ার টাকা যোগাড় করতে অবশেষে এখন সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শুধু তিনি একা না, ব্যান্ডসংগীতের সাথে জড়িত এখন অনেকে সবজি বিক্রি বা ভ্যান চালাচ্ছে।
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, নকীব খান, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, পার্থ বড়ুয়ার প্রত্যেকেরই উত্থান চট্টগ্রাম থেকেই। তাদের মধ্যে বেশিরভাগেই জন্ম চট্টগ্রামেই। এ ছাড়া ব্যান্ডসংগীতের তারকা নাসিম আলী খান, সুব্রত বড়ুয়া রনি, মোহাম্মদ আলী, আহমেদ, নেওয়াজ, পিলু খান, এসআই টুটুলও চট্টগ্রাম থেকেই জনপ্রিয়তা পেয়েছেন ব্যান্ডসংগীতকে। কিন্তু করোনাকালীন সময়ে হারিয়ে যাচ্ছে ব্যান্ডসংগীতের সাথে জড়িতরা। পরিবর্তন করেছে এই পেশা অনেকেই।

সাব্বির (ছদ্মনাম)। খুব ভাল গিটারিস্ট। কিন্তু এখন তিনি ভ্যান চালক। নিজের পরিবারের খরচ সামলাতে তিনি ব্যান্ডসংগীত শিল্পী থেকে ভ্যান চালক। সকাল হলে বের হয়ে যান ভ্যান নিয়ে। আর রাতে বাসায় ফিরেন।

বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)কে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করেছি। কখনো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবো চিন্তা করেন নাই। করোনাকালীন সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পর থেকে বাসায় আছেন। কিন্তু এভাবে ত বেশি দিন বসে থাকা যায় না। মাস শেষে বাড়ি ভাড়া দিতে হয়। তাই গত ১৫ দিন ধরে ভ্যান চালিয়ে পরিবারের খরচ যোগাড় করছেন।

তিনি বলেন, ‘ভ্যান চালাই, চুরি ত করি না। তাই আমার লজ্জা লাগে না’। চাকরি পাওয়া তো সোনার হরিণ। তাই অন্য কোনকিছু না পেয়ে ভ্যান চালান। তবে প্রথম প্রথম অসুবিধা হলেও এখন হয় না। যেদিন পৃথিবীর সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে তখন আমার ব্যান্ডসংগীতের জগতে ফিরে যাবো এমন আশাবাদ করোনাকালীন ভ্যান চালকের।

চট্টগ্রাম মিউজিক্যাল ব্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি(বিএনএ)কে বলেন, উদ্বোধন থেকে সমাপ্তি যেকোন বিনোদন অনুষ্ঠানে ব্যান্ডসংগীতের ডাক থাকতো সবার আগে। করোনাকালীন কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের জীবন কেমন যাচ্ছে তার খোঁজখবর নেয়ার কেউ নেই। প্রণোদনা নামক শব্দটা শুনেছেন বলে আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, তাদের কপালে এটি জুটেনি, সম্ভাবনাও নেই।

ইকবাল হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম মিউজিক্যাল ব্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনের ১১০টা ব্যান্ড দলের রেজিস্ট্রেশন আছে। তারমধ্যে ৮০টি দল সক্রিয় রয়েছে। একটি দলে ৫ জন করে থাকলে চারশত সদস্য রয়েছে। আছে যন্ত্র, সাউন্ড ও সংগীত শিল্পী। সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার সদস্য এখন বেকার। সবাই আর্থিক দিক দিয়ে সামর্থবান না যে, তিন মাস বসে বসে খেতে পারবে। তিনি ব্যান্ডসংগীতের শিল্পীদের জন্য সরকারি -বেসরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা কামনা করে বলেন, মানবতার এমন সংকট আগে কখনো দেখেনি দেশ!

সম্পাদনায়: ওয়াই এইস, আহা